Categories

দুর্বলতা

< All Topics

‘সত্যানুসরণ’-এর প্রথম বাক্যটিই একটি নভঃকম্পী বজ্রনির্ঘোষ বাণী। কোথায়
শাস্ত্রপ্রবক্তার সেই সিদ্ধি-স্মিতি মণ্ডিত প্রশান্ত মুখনিঃসৃত ধ্যানাত্মিকতার বাণী, তা নয়,
যুদ্ধার্থে ছৎকার! হ্যাঁ , যুদ্ধই তাে! এলিয়ে পড়া, নেতিয়ে পড়া, থিতিয়ে পড়া অকালস্থবির
প্রতিটি মানুষের প্রতি এ-যুগের দেহধারী পরমপুরুষের কঠিন আহ্বান বীর হতে হবে।
অপূর্ব গ্রন্থ এই সত্যানুসরণের উদ্বোধনী বাণীটিই এই জেগে ওঠার আহ্বান। এই
আহ্বানবাণী কাঁপিয়ে দিলাে আকাশকে, মনুষ্যশক্তির বুকের মধ্যে জাগিয়ে দিলাে এক
সংকল্পবদ্ধ চারণকবিকে। সে বলে বেড়াতে লাগলো হ্যাঁ , এই তাে পেয়েছি! শক্তির
উৎস এবার খুলে গিয়েছে হৃদয়ে। ধ্যান স্তব্ধ নিথর ঝিমুনি নয়, এবার ইচ্ছে করছে
হ্রেষারবে ধরিত্রী কাপিয়ে দিগ্বিদিকে ছুটে বেড়াতে, জাগরণ আর সাহসিকতার বীজমন্ত্রকে
উজ্জীবিত করে সকলকে ছুটিয়ে নিয়ে বেড়াতে।

সর্বাগ্রে তাই শক্তিমন্ত্রে জাগ্রত করতে চাইলেন সবাইকে। নাম-ধ্যানের ভ্রান্ত ধারণায়
যে ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে দিন কাটাতে চায়, তার কানের কাছে আগে বজ্রকণ্ঠে হাঁক দিলেন
ওঠো, জাগাে! শক্তির তনয়দের ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দিন কাটানাে শােভা পায় না। এ সব
ধর্মসম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণার বহিঃপ্রকাশ। ধর্ম হলাে, আত্মপ্রত্যয়ের অন্তঃস্থ উৎস। আত্মপ্রত্যয়ের
মূলকথা শক্তি। সর্বশক্তিমান্ পরমপিতার তজ্জাত সম্তান কখনও দুর্বল হতে পারে না।
দোদুল্যমান হতে পারে না। অবসাদের শিকার হতে পারে না। ইষ্টপুরুষে প্রত্যয় হারাতে
পারে না। ইষ্টে প্রত্যয় থাকলে দুর্বলতা আসতে পারে না। বিশ্বাস কেঁপে উঠলে, দ্বিধাগ্রস্ত
হলে তবেই আসে দুর্বলতা। আসে অবসাদ। তখন পা কাঁপতে থাকে, একপাও এগুনাে
যায় না। সেটাই হলাে পরম পতন। চরম সর্বনাশ। ধর্মরাজ্যে ঢােকার পথ তখন
অবরুদ্ধ। দুর্বল মানুষ তাই বিশ্বাসহারা। আর বিশ্বাসহারাই তাে ইষ্টহারা। তার কাছে
ধর্মরাজ্যের দ্বার বন্ধ।

তাই পরমপুরুষের দেহধারী সদাজাগ্রত ইষ্টপুরুষের প্রতি আস্থা রাখতে বলেছেন।
ইষ্টপুরুষের ধ্যান ও তার ইচ্ছাপূরণের চিন্তাধারা মাথায় থাকলে স্খলন বা পতন আসতে
পারে না। তাই বলেছেন, তােমাকে সাহসী হতে হবে।

মনে রাখবে, ইষ্টে বিশ্বাস থেকেই আসে সাহস। আর সাহসী সত্তায় কপটতা আশ্রয়লাভ করতে পারে না। সাহসী সত্তায় থাকে নিনড় বিশ্বাস। আর বিশ্বাস থেকেই শক্তি।শক্তি থেকেই সাহস। শক্তিমান সাহসী ভক্তই পারে স্বর্গরাজ্যে প্রবেশ করতে। কপট ভক্ততাে আসলে ইষ্টে অগ্রথিত। বিশ্বাসের অভাবেই তার পথিমধ্যে পতন অনিবার্য।জিনিসটা যেমন সহজ, তেমনি আবার অত্যন্ত কঠিন। ইষ্টকে বিশ্বাস করাে, দুর্বলতাতােমাকে স্পর্শ করতে পারবে না। তােমার অগ্রগতিও তখন অনিবার্য। বললেন, একটাকথা মনে থাকে যেন চেষ্টা করে হেরে যাওয়াটা দুর্বলতা নয়। চেষ্টা না করে বসেথাকাটা দুর্বলতা। আগে থেকেই ধরে নিলে, তােমার দ্বারা ও-কাজ সম্ভব নয়। আর তাইধরে নিয়ে নিশ্চেষ্ট হয়ে বসে থাকলে। ওটাই দুর্বলতা। নিজের সম্পর্কে অবমূল্যায়ন ওআত্মপ্রত্যয় রাখাে। লড়ে যাও। বিশ্বাস করো তুমি যার সন্তান, তিনি সর্বশক্তিমান্।সকল শক্তির আধার জগদীশ্বর পরমপুরুষই তােমার ইষ্টপ্রতীকে আর্বিভূত। তােমারভয় কিসের? তােমার অসাধ্য কী আছে? এই বােধ নিয়ে চেষ্টা চালিয়ে যাও!সাময়িকভাবে যদি বিফলও হও, দেখবে শেষ পর্যন্ত তােমারই জয় হয়েছে।নিজেকে দুর্বল না ভাবাটাই তাে শক্তি জোগায়। পরম শক্তিমানের সন্তানের দুর্বলতাথাকবে কেন? দুর্বলতাটা তােমার সৃষ্টি। ঈশ্বরে অবিশ্বাস, ইষ্টে অবিশ্বাস, তাই-আত্মশক্তিতে অবিশ্বাস। এ তাে মরণের রাস্তা।

এই মৃত্যুপথ থেকে মানুষকে ফিরিয়ে এনে জীবনপথে প্রতিষ্ঠিত করতে চেয়েছেন।
ঠাকুর। তাই বলেছেন, ইষ্টে বিশ্বাস রাখাে। নিজের অন্তঃস্থ শক্তিকে বিশ্বাস করাে,
দেখবে তুমি আপাত-অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলতে পারছাে। নিজেকে দুর্বল ভেবাে
না। দুর্বলের চিন্তা করে দুর্বল হয়াে না। সর্বশক্তিধরের আত্মজের পক্ষে এই দুর্বলতার
চিন্তা পাপ। বলবানের চিন্তা করাে, বলবান হবে। দুর্বলের দ্বারা কোন কাজই সম্ভব নয়।
সে জীয়ন্তের তালিকা থেকে বাতিল।

কাজেই শক্তি চাই, আত্মপ্রত্যয় চাই। আত্মশক্তিতে বিশ্বাস এলে, দেখবে, তােমার
ক্ষমতার তুলনা নেই। কাজেই ঠাকুর সর্বপ্রথম হুংকার দিয়েছেন দুর্বলতার বিরুদ্ধে।
আত্মশক্তির জাগরন চেয়েছেন। বিশ্বাস থাকলে, আত্মশক্তির চর্চা থাকলে ইষ্টপরায়ণ
ব্যক্তির বিজয়রথ পথিমধ্যে বাধাপ্রাপ্ত হতে পারে না।
তাই, সর্বশক্তিমানের অনুসরণই সত্যানুসরণ। সকল শক্তির আধার পরমপুরুষই
সত্য। তাঁকে মেনে তাঁকে অনুসরণ করাই সত্যানুসরণ।

আর এই সত্যানুসরণের প্রথম মরকোচই হলাে আত্মশক্তিতে বিশ্বাস। তাই, দুর্বলতার
চিন্তাকে প্রহার করলেন এমন নির্ম্মম হস্তে। সত্যানুসরণ গ্রন্থের প্রারম্ভিক বাক্যই তাই

দুর্বলতার বিরুদ্ধে জেহাদের বাণী। বললেন, দুর্বলতার ধ্যানকারীর পক্ষে ধর্মরাজ্যের
দুয়ার চিররুদ্ধ। ধর্মজগতে সে চির-বাতিল। মনুষ্য সমাজে সে মৃত সৈনিক। অধার্মিক
মানুষের মুখচিত্রই মৃত মানুষের মুখচিত্র।
মৃত সৈনিকের ভূমিকায় অভিনয় করার জন্য তুমি এই বিশ্বরঙ্গমঞ্চে নামােনি।
সর্বশক্তিমান পরমপুরুষের মহাশক্তিধর তজ্জাত সন্তানরূপে তােমার আবির্ভাব। তােমার
মতাে বলবান আর কেউ নেই। জেগে ওঠো এই মহাপ্রত্যয়ে। এই আহ্বান দিয়েই
সত্যানুসরণের শুরু।

সত্যই হলাে পরম শক্তি। পরমশক্তি এবং পরমশক্তিধরের তপ-ই তাই চরম শক্তি-
তপস্যা। দেহধারী শ্রীভগবানই তাই তােমার যুগলভ্য নিত্য ধ্যেয় শক্তিবিগ্রহ। এই
ব্যবস্থার কোন বিকল্প নেই।

অনেক ভক্ত-সমালােচক সত্যানুসরণকে এ-যুগের গীতা বলে অভিহিত করেছেন।
গীতা মূলতঃ ঈশ্বরের বাণী। নররূপী নারায়ণ শ্রীকৃষ্ণ তার একনিষ্ঠ ভক্ত মহাবলবান
যােদ্ধা-বীর অর্জুনের নানাবিধ প্রশ্নের সুমীমাংসাসূচক উত্তর দিয়েছেন গীতায়। গীতা তাই
সমাধান সূত্রাবলী সমন্বিত ঈশ্বরীয় বাণী।
গীতাবাক্য তাই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণ। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধাঙ্গণে এই সর্বসমস্যা-
সমাধানী মহাভাষণের শ্রোতা মাত্র একজন ঐ ধনঞ্জয় অর্জুন। ঐ একজনকে উপলক্ষ্য
করে বলা ঈশ্বরীয় ভাষণ আসলে বিশ্বের সমগ্র মনুষ্যসমাজের প্রতি লােকত্রাতা
পরমপুরুষের দিব্য ভাষণ। আত্মােখ্যানের সবল স্বনিষ্ঠ রণােন্মাদনা।

এ যুগের সত্যানুসরণও সেই ভূমিকাই পালন করেছে। তবে, এখানে প্রশ্নকর্তা
অনুপস্থিত। যত প্রকার প্রশ্ন মানুষের মনে আসতে পারে, সে-সব নিজের মন থেকে বুঝে
নিয়ে যুগপুরুষ অনুকূলচন্দ্র এখানে জীবন ভাষ্যকাররূপে আবির্ভূত। তাই, এ-গীতায়
প্রশ্নকর্তা নেই। প্রশ্নকর্তা তুমি, আমি, সবাই। এ যুগ-গীতার অন্তঃসার তাই
দুর্বলতার প্রসঙ্গে আবার বলেছেন, যেখান থেকে দুঃখটা আসছে, মনকে যদি তার
মধ্যেই ডুবিয়ে রাখাে, তবে তােমার দুঃখও ঘুচবে না দুর্বলতাও ঘুচবে না। এই অবস্থা
থেকে উঠতে গেলে ঐ দুঃখের উৎপত্তিস্থলকেই আগে মুছে ফেলতে হবে। সৎচিন্তা এবং
সৎকর্মকে আশ্রয় করতে হবে। মনে রাখবে সৎচিন্তা মানে ইষ্টচিন্তা এবং সৎকর্ম হলাে
ইষ্টের কর্ম। অন্য চিন্তা এবং অন্য কর্ম হলাে জঞ্জাল। ঐ দুটি পাপকে মন থেকে মুছে।
ফেলতে হবে। সর্বদা মনে রাখতে হবে তুমি অমৃতের সন্তান। চিরচেতন অমৃতপ্রবাহ
তােমার মধ্যে ক্রিয়াশীল। কাজেই সেই অমৃতপুরুষের ধ্যান করাে, দুর্বলতামুক্ত এবং
অম্লান হয়ে উঠতে পারবে। অমরণতত্ত্ব তােমার করায়ত্ব হবে।
সৎচিন্তা মানে কর্মহীন উচ্চচিন্তায় জড়বৎ হয়ে যাওয়া নয়। সে এক অপমৃত্যু, অসুস্থতা।

চির জাগরণের বীজ রয়েছে তােমার ভিতরে, ইষ্টকর্মের সেচ দিয়ে সেই
বীজকে অঙ্কুরে পরিণত করাে। তারপরে সেই চারাগাছের পরিচর্যা করে তাকে মহীরুহের
রূপদান করাে। জগদব্রহ্মাণ্ডের মালিক এবার পাবনার গ্রাম্য ভাষায় কথা বললেন।
বললেন, উয়ের মতাে আর কাম নেই। সবই কয়্যা দিলেম, এবার করবের পারলিই হয়,
এক তুড়িত্ই বাজিমাৎ।

এখানে একটা কথা বলে রাখা ভালাে। আধ্যাত্মিকতা মানে যা যা নিয়ে মানুষের
পার্থিব জীবন, তার সবগুলির সমন্বিত আলােচনা। এই আধ্যাত্মিক আলােচনার সর্বশ্রেষ্ঠ
গ্রন্থ গীতা। গীতা ভাষণাত্মক গ্রন্থ। কৃষ্ণভক্ত ধনঞ্জয় অর্জুন এখানে প্রশ্নকর্তা এবং
শ্ৰীভগবান স্বয়ং সেই সমস্ত প্রশ্নের উত্তরদাতা। গীতা নিঃসন্দেহে পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ
ভাষণ। কিন্তু এই সুদীর্ঘ সর্বশ্রেষ্ঠ ভাষণের শ্রোতা মাত্র একজন –
কখনাে বােদ্ধা, কখনও বিস্মরণশীল এবং সংশয়গ্রস্ত। এ সব-কিছুর মােচনার্থে শ্রীভগবানকে
কখনাে পুনরুক্তি করতে হয়েছে কখনাে বা সমধর্মী অন্য প্রসঙ্গ টেনে এনে তা নিয়ে
আলােচনা করতে হয়েছে।
সত্যানুসরণে সাক্ষাৎ প্রশ্নকর্তা কেউ নেই। তাই লেখককে সন্ধিৎসু এবং প্রাজ্ঞ
পাঠকের জন্য আপন কল্পনাজাত বহুবিধ প্রশ্নের সর্বকালীন উত্তর লিপিবদ্ধ করতে
হয়েছে।

কথিত আছে, সত্যানুসরণ অতুলচন্দ্র ভট্টাচার্য্য নামক জনৈক জিজ্ঞাসু ভক্তের
উদ্দেশ্যে নানাবিধ সম্ভাব্য সমস্যার সদুত্তর হিসাবে লিখিত গ্রন্থ। এখানেও উদ্দিষ্ট ব্যক্তি
একজনই। কিন্তু কাজে লাগছে সমস্যাপীড়িত সমগ্র মানবজাতির। যাঁরা এই ক্ষুদ্র
গ্রন্থটিকে গীতার সঙ্গে তুলনা করেছেন, তাঁরা ভুল কিছু করেননি। আমি শুধু এইটুকু
বলতে চাই,গীতায় একজন সমাজসচেতন শাস্ত্রজ্ঞ অতি বুদ্ধিমান প্রশ্নকর্তা বিদ্যমান
রয়েছেন সামনে। তাই শ্রীভগবানের পক্ষে উত্তরদান অপেক্ষাকৃত অনায়াসের ফসল।
সত্যানুসরণের লেখকের সামনে তেমন কোন প্রশ্নকর্তা না থাকায় লেখককেই মানব-
জাতির নানাবিধ সম্ভাব্য প্রশ্নকে সামনে এনে সে-সকলের সদুত্তর প্রণয়ন করতে হয়েছে।
তাই, এ-কাজ অপেক্ষাকৃত কঠিন। এজন্যে সত্যানুসরণের লেখককে সর্বশ্রেণীর মানবমনের
নির্ভুল পাঠক হতে হয়েছে সর্বাগ্রে। সত্যানুসরণকার শ্রীশ্রীঠাকুরকে হতে হয়েছে একজন
বিশিষ্ট মনােরােগ বিশেষজ্ঞ।

দুর্বলচিত্ত ব্যক্তিদের সম্পর্কে পরমপুরুষ বলেছেন, তারা চরিত্রের দিক দিয়ে কুটিল
এবং ইন্দ্রিয়পরায়ণ হয়। আবার এর ফলে এই হতভাগ্যরা ভগ্নস্বাস্থ্য এবং রুগ্নই হয়ে
থাকে। এদের দুর্ভোগের শেষ নেই। এদের মনে শুধু অশান্তি আর অশান্তি। শান্তি এবং
সুখ শব্দ-দুটির অর্থই এরা ভুলে যায়। এদের সম্বল শুধু বিষ, বিষাদ এবং অশান্তি।
মানসিক রােগের হাতধরা হয়ে ছড়িদারি করতে থাকে কায়িক রােগসমূহ।

Table of Contents